Ads

প্রধান শিক্ষকের এক সিদ্ধান্তে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরল ৯০০ শিক্ষার্থী!

 প্রধান শিক্ষকের এক সিদ্ধান্তে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরল ৯০০ শিক্ষার্থী!



নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও বন্যা থেকে সময়মতো স্কুল খালি করে শত শত শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচালেন প্রধান শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩০ আগস্ট ২০২৬

নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রধান শিক্ষকের তাৎক্ষণিক দূরদর্শিতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী।

ঘটনাটি ঘটেছে নেপালের নুয়াকোট জেলার ‘ত্রিভুবন ত্রিশূলি সেকেন্ডারি স্কুলে’। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কারণে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও প্রাণে বেঁচে যায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী।

কয়েক মিনিটের সতর্কবার্তা, বদলে দিল পরিস্থিতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রিভুবন ত্রিশূলি সেকেন্ডারি স্কুলে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৬০০-এর বেশি। ঘটনার দিন মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে চারটি ভিন্ন নম্বর থেকে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির কাছে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা আসে।

উজান এলাকার তিলকান্দা ও বেত্রাবতী নদীর তীরবর্তী বসতিগুলো পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন তিনি।

সঙ্গে সঙ্গে কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে পুরো স্কুল ভবন খালি করার নির্দেশ দেন প্রধান শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের দ্রুত সংগঠিত করে নিরাপদ উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

‘আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না’   

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি বলেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার পর তিনি বুঝতে পারেন যে আর কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, বন্যা শেষ পর্যন্ত না এলেও শিক্ষার্থীদের বড়জোর এক দিনের পড়াশোনা নষ্ট হতো। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব ছিল না।

তাই সময় নষ্ট না করে তিনি দ্রুত স্কুল খালি করার সিদ্ধান্ত নেন।

চোখের সামনে তলিয়ে গেল ছাত্রাবাস

শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে স্কুলের পেছনের সরু ও কর্দমাক্ত পাহাড়ি পথ দিয়ে উঁচু এলাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

ঠিক সেই সময় শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পায়। নদী থেকে মাত্র প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা স্কুলের ছাত্রাবাস ভবনটি মুহূর্তের মধ্যে পানির প্রবল স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকে।

চারপাশে তখন শুধু পানির ভয়াবহ স্রোত। চোখের সামনে ভেসে যেতে থাকে এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা ও বাজারের অংশ।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি বলেন, সিদ্ধান্ত নিতে যদি আর মাত্র ১০ মিনিট দেরি হতো, তাহলে শিক্ষার্থীসহ স্কুলের অন্যদেরও হয়তো বেঁচে থাকার সুযোগ থাকত না।

‘মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে ফিরেছি’

প্রধান শিক্ষকের দ্রুত সিদ্ধান্তে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একজন ১৬ বছর বয়সী ইউনিশা।

বিবিসিকে দেওয়া বক্তব্যে সে জানায়, সতর্কবার্তা পাওয়ার পরপরই সে ও তার সহপাঠীরা স্কুলের পেছনের সরু পাহাড়ি পথ ধরে দৌড়ে উঁচু জায়গায় উঠতে থাকে।

ইউনিশার ভাষায়, তারা মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রাণে বেঁচে ফিরেছে।

নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর পর তাদের চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে পানির তোড়ে পুরো বাজার এলাকা ভেসে যেতে দেখা যায়।

পরিবারের উৎকণ্ঠা

বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইউনিশার পরিবারও চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে যায়।

ইউনিশার মা সাবিনা শ্রেষ্ঠা জানান, মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া পাচ্ছিলেন না। মেয়ের পাশাপাশি তার বাবার ফোনেও বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি।

দীর্ঘ সময় পর যোগাযোগ সম্ভব হলেও মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। অবশেষে তিন দিন পর ইউনিশা অক্ষত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসে।

মেয়েকে ফিরে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তার মা। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ঈশ্বর তার মেয়েকে রক্ষা করেছেন।

একজন শিক্ষকের সিদ্ধান্ত, শত শত প্রাণের নিরাপত্তা

নেপালের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, দুর্যোগের মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের একটি সিদ্ধান্ত কখনো কখনো শত শত মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি যদি সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারত।

একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়। দুর্যোগের সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নেপালের এই প্রধান শিক্ষক সময়মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই দায়িত্বেরই অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন।

একটি সঠিক সিদ্ধান্ত—প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীর নতুন জীবন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ